অনলাইন বিজনেস শুরু করার আগে করণীয়, তথ্য প্রযুক্তির যুগে আমাদের জীবন যেমন হয়ে গিয়েছে সহজ তেমনি রয়েছে পর্যাপ্ত বাঁধা। ইন্টারনেট  পৃথিবীকে নিয়ে আগত হাতের মুঠোয়। বিনোদন ব্যতীতও ইন্টারনেট আজকাল অনেকের জন্য রোজগারের সেরা উৎস। কক্ষে বসেই আরম্ভ করা যাচ্ছে ব্যবসা যার কাস্টোমার হতে পারে একটানা পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের যেকোন মানুষ।

অনলাইনে ব্যবসা শুরু করা অতিশয় দৃঢ় কিছু নয়, আবার একেবারে সোজা এমনটাও নয়। যেকোন ব্যবসা শুরুর প্রথমে কয়েকটি করনীয় থাকে– বিজনেসের প্ল্যান করা কিংবা স্ট্র্যাটেজি সাজানোর মত সুক্ষ্ম অথচ অত্যন্ত জরুরী বিষয়গুলো প্রায়ই উপেক্ষা করার জন্য দেখা যায় নিউ উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে। যার ফলে ব্যবসা শুরুর পরে কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট নোটিশ যায় না, পক্ষান্তরে টিকে থাকাই হয়ে উঠে মুশকিল। আজকে আমরা আলোচনা করব এমনই কিছু করনীয় নিয়ে যা অবশ্যই অনলাইন বিজনেস শুরু করার আগে করণীয়। প্রথমে জেনে নেই কি কি বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজনঃ

১. পণ্য/সার্ভিস

২. মার্কেট এনালাইসিস

৩. বিজনেস প্ল্যান

৪. সাপ্লাই চেইন ও ডিস্ট্রিবিউশন

৫. ওয়েবসাইট এবং সোশাল মিডিয়া

৬. মুল্যবান ডকুমেন্ট

৭. প্রচার এবং সেলস

আসুন এই সময়ে ডিটেইলস জানা যাক।

১. পণ্য/সার্ভিস

প্রথমেই ঠিক করুন কোন পণ্য কিংবা সার্ভিস দিয়ে ব্যবসা করবেন। ইন্টারনেটে অসংখ্য উদ্যোক্তা বিভিন্নরকম পণ্যের অথবা সার্ভিসের ব্যবসা করছেন, আপনি কি শক্তিস্তর করবেন ঠিক করার জন্য হবে আপনাকেই। কারো দেখাদেখি অথবা অনুকরণ না করে নিজে যে পণ্যের ওপর আশ্বাস করেন, যে পণ্য নিয়ে আপনার চমৎকার আন্দাজ বিদ্যমান সেটা নিয়েই আগান। ধ্যান করুন আপনার পণ্য আপনি নিজে ব্যবহার করবেন কিনা বা আপনার পরিবার, বন্ধুবান্ধব প্রয়োগ করবে কিনা। এই সাধারণ ১টি স্মরণ আপনাকে বেশ কনফিডেন্স যোগাবে, সাথে আপনি নিজে বুঝতে পারবেন ঠিক পণ্য নিয়েই আগাচ্ছেন কিনা।

২. মার্কেট এনালাইসিস

কি নিয়ে বিজনেস করবেন ঠিক করলেন, কিন্তু সে পণ্যের ডিমান্ড কেমন, কারা কিনবে, কতবার কিনবে এধরণের ব্যাপারগুলো নিয়ে স্টাডি করুন। লক্ষ্য গেল এরূপ পণ্য নিয়ে কাজ করছেন যেটার তেমন ডিমান্ড নেই, অথবা আপনার পণ্যের লক্ষ্য কাস্টোমারদের কাছে শক্তিস্তর না করে যার ডিমান্ড নেই তার নিকট সেল করার জন্য চাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে বিজনেসের গ্রোথ আশানুরুপ হবে না, বরং ব্যর্থ হবার সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।তাই মার্কেট বুঝুন সুন্দর করে। যাদের লক্ষ্য করছেন কাস্টোমার হিসেবে তাদের সাথে কথা বলুন, সার্ভে করতে পারেন, কম্পিটিটরদের এক্টিভিটি দেখুন, তাদের পেইজ কিংবা গ্রুপে কাস্টোমার কি মতামত দিচ্ছে তার সাথে কি চাচ্ছে অভিনিবেশ দিয়ে বিশ্লেষণ করুন,  অন্যজনের দোষ হতে নিজে শিখুন।

৩. বিজনেস প্ল্যান

সবচেয়ে বেশি উদ্যোক্তারা যে ভুলটা করে থাকেন তা হল ১টি প্রোপার বিজনেস পরিকল্পনা না করা। কেবলমাত্র মুখে মুখে অথবা অনুমান করে নয়, একটি টেমপ্ল্যাট ধরে অবিরাম বিজনেস প্ল্যানটি লিখুন। এতে কোথায় কি প্রকারের গ্যাপ রয়েছে নিজেই বুঝে যাবেন। প্রকৃতপক্ষে একটি বিজনেস পরিকল্পনা আপনার আইডিয়াকে এমনভাবে সাজিয়ে তুলবে যাতে আপনি বুঝতে পারেন আপনার স্ট্র্যাটেজি কিরকম হওয়া উচিৎ, আপনার একটা সুনির্দিষ্ট টার্গেটে পৌঁছাতে একটানা ওয়ার্ক প্রসেস কেমন থেকে হবে। প্রচুর বেশ ভালো বিজনেস আইডিয়া ফেইল করতে পারে শুধুমাত্র সুগঠিত প্রসেস অথবা স্ট্র্যাটেজি না থাকার কারনে। ১টি চমৎকার বিজনেস পরিকল্পনা আপনাকে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিসিশন নিতে সহযোগিতা করবে, মাঝপথে যেন খেই হারিয়ে না ফেলেন তা নিশ্চিত করবে, সঙ্গে আপনার ব্যবসা সম্মন্ধে আপনি আরো চমৎকার ধারণা পাবেন, ফোকাসড থাকতে পারবেন।

৪. সাপ্লাই চেইন ও ডিস্ট্রিবিউশন

পণ্য কোত্থেকে তার সাথে কীভাবে সোর্স করবেন ঠিক করে নিন। ট্রাই করুন সোর্সিং প্রসেসটা যেন স্মুথ তার সাথে যথাসম্ভব সামান্য খরচে করা যায়, এতে প্রোডাক্টে আপনার প্রফিট মার্জিন বাড়বে। পণ্য উৎস কেবল ১টি হলে ব্যাকআপ হিসেবে আরো ২-৩টি উৎস যোগ করুন। কিন্তু পণ্যের গুণগতমান নিয়ে আপোষ করবেন না এক্ষেত্রে। সবসময় এমনভাবে সোর্সগুলোকে রেডি রাখুন যাতে কোনো কাস্টোমারকে খালি হাতে যেতে না হয়।

পণ্য নিজে ম্যানুফাকচার করলে কতটুক ম্যানুফাকচার করতে পারবেন এবং কীভাবে ম্যানুফাকচারিং প্লেস থেকে কাস্টোমারের নিকট পৌঁছাবেন তা সঠিক করুন। ডিস্ট্রিবিউশন খুবই জরুরী অনলাইন বিজনেসের ক্ষেত্রে। বেকারি পণ্যের ডিস্ট্রিবিউশন প্রসেস ফ্যাশন পণ্যের ডিস্ট্রিবিউশনের মত হবে না। সঠিক পণ্যের জন্য নির্ভুল ডিস্ট্রিবিউশন প্রসেস ঠিক করুন। নাহলে কাস্টোমার স্যাটিস্ফ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রচণ্ড বেশ ভালো প্রোডাক্ট, অতিশয় চমৎকার বিজনেস পরিকল্পনা থাকার পরেও ব্যবসা অসফল করার জন্য পারে যদি ১টি স্ট্রং সাপ্লাই চেইন তার সাথে ডিস্ট্রিবিউশন নিশ্চিত করার জন্য না পারেন। কাজেই সতর্ক থাকুন এমন ছোটখাটো ব্যাপারেও।

৫. ওয়েবসাইট তার সাথে সোশ্যাল মিডিয়া

অফলাইন বিজনেসে আমরা কাস্টোমারকে যেমনটা দোকানে প্রোডাক্ট সেল করি নির্ভুল তেমনি ইন্টারনেটে কাস্টোমারকে আমরা ওয়েবসাইটে পণ্য সেল করি। ওয়েবসাইটই আপনার মডার্ন দোকান। একটি ওয়েবসাইট থাকলে কাস্টোমার আপনাকে যেমন আধুনিক ভাববেন তেমন আপনার উপর আস্থা বাড়বে। অনলাইন বিজনেসের ক্ষেত্রে আশ্বাস খুবই জরুরি ১টি ফ্যাক্টর। কিন্তু কথা হল ব্যবসা আরম্ভ করছেন এখনই কি ৪০-৫০ হাজার টাকা ব্যয় করে ওয়েবসাইট বানাবেন? এটি মোটেও ভালো বুদ্ধি হবে না। বর্তমানে এইরকম প্রচুর প্ল্যাটফর্ম রয়েছে যেগুলো দিয়ে নিজেই ই-কমার্স ওয়েবসাইট সেটাপ করে নেয়া যায় বাহ্যিক কোনো ডেভেলপারের সহযোগীতা ছাড়াই। যেমন, বণিক প্রয়োগ করে মাত্র ৫ মিনিটে নিজের ওয়েবসাইট বানিয়ে নিন নিজেই। অর্ডার ম্যানেজমেন্ট হতে আরম্ভ করে পেমেন্ট, ডেলিভারি এবং ই-কমার্সের সমস্ত ফিচার পেয়ে যাবেন। সব ম্যানেজ করতে পারবেন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও ওয়েব প্যানেল যেকোনো স্থান থেকেই।

তাছাড়া নিজের বিজনেসের জন্য ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামের মত সোশাল মিডিয়াগুলোতে পেইজ খুলে ফেলুন। ওয়েবসাইটটি পেইজে যোগ করে দিন। দিন দিন পেইজে কন্টেন্ট দিয়ে একটিভ থাকুন, কাস্টোমারের মেসেজ তার সাথে কমেন্টের রেসপন্স করুন। সাথে নিজের বিজনেসের একটা সমাজ তৈরি করে তুলুন এফবি গ্রুপের মাধ্যমে। এতে আপনার কাস্টোমাররা নিজেদের অভিব্যাক্তি আরো সহজে দিতে পারবে, আপনার আপডেট আরো ফাস্ট পাবে। কমিউনিটির সাহায্যে ব্র্যান্ড বিল্ড করা এবং লয়াল কাস্টোমারবেইজ বানানো প্রচুর অধিক ইফেক্টিভ হতে পারে।

তবে শুধুমাত্র এফবিতে বিক্রি করবেন না, এফ-কমার্স থেকে ই-কমার্সে পরিণত করাটা অলওয়েজ মাথায় রাখা উচিত। নাহয় পর্যাপ্ত ইম্পোর্টেন্ট ডেটা আপনি হারাবেন যা আপনার বিজনেসের উন্নতিতে সহযোগিতা দিবে।

৬. প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট

ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য কোনো ধরণের পারমিশন, লিগাল ডকুমেন্ট থাকা আবশ্যকীয় হলে করে ফেলুন। বিজনেস আইডি, ট্রেড লাইসেন্স, TIN অথবা কোনো পণ্য বিশেষ কাগজ পাতা থাকলে ইন্টারনেট অথবা নিজে গিয়ে খোঁজ নিয়ে সেরে নিন। ট্রাই করুন ব্যবসা শুরুর পর যেন জটিলতা দৃষ্টিপাত না করে চলা যায় এবং পূর্ন মনোযোগ ব্যবসায় দেয়া যায়।

৭. মার্কেটিং তার সাথে সেলস

ব্যবসা চালু করেছেন এখন তো সেলস দরকার। সেলস আনতে প্রচার চালু করুন। প্রচার মানেই কেবলমাত্র পোস্ট বুস্ট করা নয়। মার্কেটিংয়ের জন্য প্রসেস ফলো করুন, এক্ষেত্রে কোনো মার্কেটিং ফানেল অনুসরণ করে সেলস জেনারেট করুন। আপনার পণ্য ব্যবহার করবে এইরকম ১টি আদর্শ মানুষের প্রোফাইল বানান, যাকে Ideal Customer Profile(ICP) বলে। আপনার সব মার্কেটিং প্ল্যান এই আইসিপির মানুষের সঙ্গে কতটুক যৌক্তিক বিবেচনা করে সাজান। ওয়েবসাইটে এই আইসিপি হতে ভিজিট আনুন, ভিজিটরদের রিটার্গেটিং করুন। সোশ্যাল মিডিয়াতে এনগেইজিং পোস্ট করুন, নিজের ব্র্যান্ডকে অবগত করে তুলুন। ভাইরালিটির উপর জোর দিন, এতে পেইড প্রমোশনের চাইতে ওয়ার্ড বন্ধ মাউথ অধিক হবে তার সাথে এর মাধ্যমে প্রচুর সহজে কম খরচে বেশি রিচ করার জন্য পারবেন অর্গানিকালি।

প্রথমে একজন কাস্টোমার আনুন, এরপরে ১০ জন, এরপরে ১০০ জন এভাবে লক্ষ্য সেট করে সেলস স্ট্র্যাটেজি ঠিক করুন তার সাথে সে অনুসারে মার্কেটিং করুন।

সর্বোপরি, ধৈর্য্য ধরে ব্যবসা এগিয়ে নিন। রাতারাতি সাফল্য আসবে না, লক্ষ্য ধরে ধরে আগাতে হবে। অলটাইম নতুন ট্রেন্ড কিংবা নিউ বিধানের সাথে আপডেটেড থাকার চেষ্টা করুন। কাস্টোমারের কথা শুনুন, তাঁদের মতামতের গুরুত্ব দিন। ব্যবসায় কাস্টোমারই সব।

অনলাইন ব্যবসার সুবিধা অসুবিধা